হামের প্রাদুর্ভাব: ৬ মাসে ১,০৩০ মৃত্যু, আক্রান্ত ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি

হামের প্রাদুর্ভাব: ৬ মাসে ১,০৩০ মৃত্যু, ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি আক্রান্ত। টিকাদান ঘাটতি, পুষ্টিহীনতা ও B3 স্ট্রেইনের প্রভাব। লক্ষণ, প্রতিরোধ ও করণীয়

হামের প্রাদুর্ভাব: ৬ মাসে ১,০৩০ মৃত্যু, আক্রান্ত ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি

বাংলা গাইড ২৪

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬  |  সর্বশেষ আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরাসরি উত্তর: বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ১,০৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৯৩০ জন মারা গেছেন। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জন। ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ১২৪ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন এবং সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ জন। মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকা বিভাগই শীর্ষে—এককভাবে ৪৮২ জন

📝 লেখকের অভিজ্ঞতা: ঢাকার শিশু হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের অনেককে জটিলতা নিয়ে ভর্তি করা হচ্ছে। অভিভাবকদের অনেকেই বলছেন—শিশুর জ্বর ও র্যাশ দেখা দেওয়ার পরও তারা বুঝতে পারেননি যে এটি হাম। কেউ কেউ স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে—হাম নিয়ে সচেতনতার অভাব এখনো ব্যাপক।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি: সংখ্যায় হাম

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা) হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১,২৩২ জন

মৃত্যুর সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকা বিভাগ। এককভাবে এই বিভাগে ৪৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

বিষয় সংখ্যা
মোট মৃত্যু১,০৩০ জন
নিশ্চিত হামে মৃত্যু১০০ জন
উপসর্গে মৃত্যু৯৩০ জন
মোট আক্রান্ত (উপসর্গসহ)১,৭২,৭২০ জন
নিশ্চিত আক্রান্ত (ল্যাব)২০,১২৪ জন
হাসপাতালে ভর্তি১,৫২,১১৭ জন
সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র১,৪৬,৪০০ জন
বাংলাদেশে হামের টিকাদান কর্মসূচি — স্বাস্থ্যকর্মী শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দিচ্ছেন
হাম প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ছবি: সংগৃহীত

বিভাগভিত্তিক পরিস্থিতি

গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ঢাকা বিভাগে ৫২৪ জন, চট্টগ্রামে ২৭৮ জন, সিলেটে ১৫০ জন, বরিশালে ১৩১ জন, খুলনায় ৮৮ জন, ময়মনসিংহে ৫৭ জন, রংপুরে ২৬ জন এবং রাজশাহীতে ২৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগ গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত মোট মৃত্যু
ঢাকা৫২৪ জন৪৮২ জন
চট্টগ্রাম২৭৮ জন
সিলেট১৫০ জন
বরিশাল১৩১ জন
খুলনা৮৮ জন
ময়মনসিংহ৫৭ জন
রংপুর২৬ জন
রাজশাহী২৩ জন

হামের প্রাদুর্ভাব কেন বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে।

১. টিকাদান কভারেজে ঘাটতি: কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ফলে অনেক শিশু হাম-রুবেলার টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে হামের বিরুদ্ধে উচ্চ টিকাদান কভারেজ ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমে গেছে।

২. অপুষ্টি: অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকলে হাম দ্রুত জটিল রূপ নেয়।

৩. ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা: ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে হামের ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে আশপাশের অনেক শিশু আক্রান্ত হতে পারে।

৪. সচেতনতার অভাব: অনেক অভিভাবক হামের প্রাথমিক লক্ষণ চিনতে পারেন না। জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে অনেকে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ান, যা জটিলতা বাড়ায়।

হামের লক্ষণ ও জটিলতা

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি নাক, গলা ও শ্বাসনালীর কোষে সংক্রমণ ঘটায়। এরপর রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রধান লক্ষণ:

  • উচ্চ জ্বর: ১০৩°F থেকে ১০৫°F পর্যন্ত উঠতে পারে
  • কাশি ও সর্দি: সাধারণ ঠান্ডার মতো শুরু হয়
  • চোখ লাল হওয়া: কনজাংটিভাইটিস বা চোখ দিয়ে পানি পড়া
  • কোপলিক স্পট: গালের ভেতরের অংশে ছোট সাদা দাগ
  • শরীরে লাল ফুসকুড়ি: প্রথমে মুখ ও গলায়, পরে সারা শরীরে ছড়ায়

সম্ভাব্য জটিলতা:

  • নিউমোনিয়া: হামের সবচেয়ে সাধারণ ও গুরুতর জটিলতা। হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
  • ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন: তীব্র ডায়রিয়ার কারণে শিশু দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • কানের সংক্রমণ: কানে ব্যথা ও পুঁজ নির্গমন হতে পারে।
  • এনসেফালাইটিস: মস্তিষ্কের প্রদাহ, যা প্রতি ১,০০০ শিশুর মধ্যে ১ জনের ক্ষেত্রে হতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল: হাম থেকে সেরে ওঠার পরও কয়েক সপ্তাহ ধরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে।

🔴 গুরুত্বপূর্ণ: হামে আক্রান্ত শিশুর জ্বর, কাশি বা র্যাশ দেখা দিলে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়াবেন না। দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। বিশেষ করে যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেয়।

টিকাদান কর্মসূচি: কত শিশু টিকা পেয়েছে

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে। এটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।

সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে টিকা দেওয়া। কিন্তু টিকা গ্রহণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৯ দশমিক ৮ শতাংশে।

টিকাদান কর্মসূচি তিন ধাপে পরিচালিত হয়েছে—প্রথমে ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে এবং তৃতীয় ধাপে ২০ এপ্রিল সারা দেশে একযোগে টিকাদান শুরু হয়, যা এখনো চলমান।

দেশে এখনো হামের প্রাদুর্ভাব থাকায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে ব্যাপক টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।

হাম প্রতিরোধে করণীয়

হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। এছাড়াও কিছু সতর্কতা মেনে চললে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।

  • নির্ধারিত সময়ে টিকা দিন: ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দিন।
  • আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখুন: হাম আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ শিশুদের থেকে দূরে রাখুন।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন: হাঁচি-কাশির সময় রুমাল ব্যবহার করুন।
  • পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করুন: শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান।
  • সচেতন থাকুন: হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য

হামের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ?

২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে ১,০৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

কোন বিভাগে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ?

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে—এককভাবে ৪৮২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৫২৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

হামের প্রধান লক্ষণ কী?

উচ্চ জ্বর (১০৩-১০৫°F), কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, গালের ভেতরে কোপলিক স্পট এবং শরীরে লাল ফুসকুড়ি ওঠা।

হামের জটিলতা কী কী?

নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন, কানের সংক্রমণ, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া।

কতজন শিশু টিকা পেয়েছে?

১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।

হাম থেকে বাঁচতে সবচেয়ে জরুরি কী?

নির্ধারিত সময়ে শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া। এছাড়া আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং জ্বর-র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

লেখক পরিচিতি

বাংলা গাইড ২৪ — স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে ১০ বছরের অভিজ্ঞ লেখক দল। আমরা স্বাস্থ্য বিষয়ক কন্টেন্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউনিসেফ, WHO, CDC-এর মতো প্রাথমিক সূত্র ব্যবহার করি। লেখক সম্পর্কে আরও জানুন →

Post a Comment