ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক "রিসেট" করতে চায় বাংলাদেশ: হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক "রিসেট" করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৫ বছরের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত ও জাতিসংঘে তারেক

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির একটি বক্তব্য দিয়ে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন—বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক "রিসেট" করতে চায়। কিন্তু এই "রিসেট" শব্দটির পেছনে আসলে কী আছে? এটি কি শুধু কূটনৈতিক ভাষার একটি নতুন চাল, নাকি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সংকেত?

এই আর্টিকেলে আমি হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ, এর পটভূমি, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করব।

⚠️ এক নজরে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক "রিসেট" করতে চায়। তিনি অতীতের ১৫ বছরের সম্পর্ককে "ঝামেলাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ ও লুটেরা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক" বলে অভিহিত করেন। তিনি আরও বলেন—"ভারত নিয়ে মুগ্ধতা থেকে বের হয়ে আসুন। ভারত কেবল আরেকটি দেশ।" একই সঙ্গে তিনি জানান, আওয়ামী লীগের আমলে ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১টি চুক্তি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য: মূল পয়েন্টগুলো

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে হুমায়ুন কবির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

✅ "আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রিসেট করতে চাই"

তিনি বলেন—"এতদিন একটি ঝামেলাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ ও লুটেরা সরকারের সঙ্গে ১৫ বছর সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এখন একটি নতুন সম্পর্কের দিকে যাব। এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমেই করব।"[reference:0]

✅ "ভারত নিয়ে মুগ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসুন"

একজন সাংবাদিক ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠক হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন—"ভারত নিয়ে মুগ্ধতা থেকে বের হয়ে আসুন। ভারত কেবল আরেকটি দেশ, যার সঙ্গে আমরা ভালো কার্যকর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চাই। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার—সব সময় খালি ভারতের কথাই ভাবলে চলবে না। নিজের দেশের কথা ভাবুন।"[reference:1]

✅ "প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দ্বিপাক্ষিক হওয়া উচিত"

তিনি বলেন—"ভারতের সঙ্গে উই ওয়ান্ট টু গুড ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ। বাইলেটারাল ভিজিটটা হলে প্রথমে ভালো হয়। উই ডোন্ট ডু অ্যা বাইলেটারাল মেসেজ ইন মাল্টিলেটারাল ভিজিট।"[reference:2]

✅ "১০১টি চুক্তি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে"

আওয়ামী লীগের আমলে ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১টি চুক্তি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।[reference:3]

পটভূমি: সম্পর্ক কেন "রিসেট" করতে চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের এই নতুন কূটনৈতিক অবস্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

১. শেখ হাসিনা যুগের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা: হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে "১৫ বছরের সম্পর্ক" প্রসঙ্গ। তিনি একে "ঝামেলাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ ও লুটেরা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক" বলে অভিহিত করেছেন[reference:4]। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত দলীয় ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এই ধারার বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়।

২. শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয়: ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তিনি ভারতে বসে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে আসছেন, যা ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে[reference:5]। বাংলাদেশ এই বিষয়টিকে সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

৩. "বাংলাদেশ ফার্স্ট" নীতি: সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর (ঘনিষ্ঠ নাম, তবে ভিন্ন ব্যক্তি) BBC-কে বলেছেন—"বাংলাদেশ এখন বলছে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'। তার অর্থ হচ্ছে, আমি কোন বিশেষ রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে চাই না।"[reference:6] এই নীতির আওতায় বাংলাদেশ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।

ব্রিকস সামিট বিতর্ক: যা ঘটেছিল

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যের ঠিক দু'দিন আগে একটি ঘটনা ঘটে, যা এই "রিসেট" বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ভারত ২০২৬ সালের ব্রিকস সামিট আয়োজন করে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু সমস্যা হলো—ভারত তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমস্টেকের চেয়ারপার্সন হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়[reference:7]

হুমায়ুন কবির এই আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন—"কে বলেছে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? বিমস্টেক চেয়ারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাহলে কেন এই প্রশ্ন করছেন?"[reference:8] বাংলাদেশ এই আমন্ত্রণকে একটি "সাংকেতিক" বার্তা হিসেবে দেখেছে—যেখানে ভারত তাকে শুধু আঞ্চলিক সংস্থার প্রধান হিসেবে দেখছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অংশীদার হিসেবে নয়।

বিশ্লেষণ: "রিসেট" মানে আসলে কী

"রিসেট" শব্দটি কূটনীতিতে খুব একটা প্রচলিত নয়। এটি মূলত প্রযুক্তির পরিভাষা—কোনো যন্ত্র আটকে গেলে তাকে রিসেট করে আবার চালু করা হয়। কূটনীতিতে এই শব্দের ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান সম্পর্ককে পুরোপুরি ভেঙে নতুন করে গড়ার ইচ্ছা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন—"ভারতকে রাজনীতির ভাষা দিয়েই বোঝানোর দরকার যে, দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে কারণ ভারত এখানে বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে। জনগণের সঙ্গে নয়। এটাই ভারতকে বোঝাতে হবে।"[reference:9]

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন—"কথা বলা থামালে সেটায় কোন পক্ষের লাভ হবে না। মি. রহমান ভারতে আসলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে আলাপটা হতো, সেটা তো আর কোন কমিউনিকেশনের বিকল্প হতে পারে না।"[reference:10]

অর্থাৎ, বিশেষজ্ঞদের মতামত স্পষ্ট—বাংলাদেশ "রিসেট" বলতে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা বোঝাচ্ছে না, বরং পুরনো ধারার বাইরে গিয়ে একটি নতুন ভিত্তির উপর সম্পর্ক দাঁড় করাতে চাচ্ছে। এই নতুন ভিত্তির মূল উপাদানগুলো হলো—সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং জাতীয় মর্যাদা।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের এই "রিসেট" নীতির পথ মসৃণ নয়। কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

১. শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর: শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং সেখান থেকে বক্তব্য দেওয়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা। ভারত যদি তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে রাখে, তাহলে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কঠিন।

২. সীমান্ত হত্যা ও অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ: বাংলাদেশের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—"অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, সার্বভৌম সমতা স্থাপন এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া।"[reference:11] কিন্তু সীমান্ত হত্যা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ রয়েছে।

৩. পানিবণ্টন চুক্তি: গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে। এই বিষয়ে সমাধান না হলে সম্পর্কে অস্থিরতা থাকবে।

৪. চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেছেন—বাংলাদেশ কোনো একক দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না।

ভবিষ্যৎ পথ: কী হতে পারে

হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাবেন এবং ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে থাকবেন[reference:12]। এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেছেন—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক সফর হওয়া উচিত, বহুপক্ষীয় ফোরামের ফাঁকে নয়। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ ধীরে কিন্তু কৌশলীভাবে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পর্কে এখনই অচলাবস্থা তৈরি হয়নি এবং সেখান থেকে ফিরে আসার পথও বন্ধ হয়নি। তবে দুই পক্ষেরই রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং সৎ আলোচনার প্রয়োজন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য

হুমায়ুন কবির কে?

হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক "রিসেট" করার বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করেন।

"রিসেট" মানে কি সম্পর্ক ছিন্ন করা?

না। "রিসেট" মানে পুরনো ধারার বাইরে গিয়ে নতুন ভিত্তির উপর সম্পর্ক দাঁড় করানো—যেখানে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও জাতীয় মর্যাদা মূল উপাদান।

কেন বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক "রিসেট" করতে চায়?

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মূলত দলীয় ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এই ধারার বাইরে বেরিয়ে "বাংলাদেশ ফার্স্ট" নীতির আওতায় সম্পর্ক গড়তে চায়।

আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া চুক্তিগুলোর কী হবে?

ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১টি চুক্তি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।[reference:13]

ব্রিকস সামিট বিতর্ক কী?

ভারত ২০২৬ সালের ব্রিকস সামিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমস্টেকের চেয়ারপার্সন হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। বাংলাদেশ এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে।

বিশেষজ্ঞরা এই "রিসেট" নিয়ে কী বলছেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সম্পর্কে অচলাবস্থা তৈরি হয়নি। তবে দুই পক্ষেরই রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সৎ আলোচনার প্রয়োজন। কথা বলা বন্ধ করলে কারো লাভ হবে না।

শেষ কথা

হুমায়ুন কবিরের "রিসেট" বক্তব্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশ আর শুধু একটি দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায় না। বরং সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায়।

তবে এই পথ সহজ নয়। শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর, পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত সমস্যা—এসব বিষয়ে সমাধান না হলে "রিসেট" শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকলে এবং সৎ আলোচনা হলে সম্পর্ক নতুন দিকে এগোতে পারে।

সময়ই বলে দেবে, এই "রিসেট" আসলে কতটা বাস্তবায়িত হয়। 🇧🇩🇮🇳

Post a Comment